শৃংখলিত বাংলার মেহেনতি মানুষ

Child working in a brick crushing factory in Bangladesh

(llbangla.org)

কমিউনিস্ট মেনিফেস্টুতে কার্ল মার্ক্স লিখেছিলেন সর্বহারাদের শৃংখল ছাড়া হারাবার আর কিছুই নেই । তিনি এই কথাটি বলেছিলেন প্রতিকি অর্থে। কমপক্ষে অফিসিয়ালী ইউরূপ তাদের দেশ থেকে দাসত্বকে বিলোপ সাধন করেছে। মার্ক্স মজুরী দাসত্বের কথা বলেছিলেন, সেই সময়ে ইউরূপের শ্রমিক শ্রেনীর লোকেরা যেভাবে নিপিড়নের শিকার হতেন আজ তৃতীয় বিশ্বের মানুষেরা ও সেই রূপ নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। আজ একুশ শতকেও আমদের দেশের মানুষ শ্রমিক শ্রেনীর লোকেরা মজুরী দাসত্বে ভোগছেন। তারা আজ একটি বর্বর চক্রেরের শোষণের শিকার। বিশ্বায়নের এই পুঁজিবাদী বাজার ব্যবস্থার কারনে তারা অধিকতর কষ্টের শিকার হচ্ছেন। এখানে এখনদাসত্ব, মানব পাচার, এবং বিশ্ববাজার ব্যবস্থার চরম শোষণ অব্যাহত আছে।

২০১২ সালেই সারা দুনিয়ার ৩৩০,০০০ থেকে ৩৬০,০০০ জন আমাদের ভাই ও বোনেরা দাসত্বের শিকার হয়েছেন। বিশ্বের যে সকল দেশে দাসত্ব প্রথার প্রচলন আছে এর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দশম। ঐতিহাসিক ভাবে দাসত্বের বিষয়টি পল্লী আঞ্চলে বেশে দেখা গেছে। আর সেখানেই আধা সামন্তবাদি প্রবনতা লক্ষ্য করা গেছে। সিংহ ভাগ জমির মালিক হচ্ছেন হাতে গুনা কয়েক জন ভূস্বামী। আর সেখানে অতি দরিদ্রের মাত্রা অনেক বেশী । বহু পরিবার প্রতি নিয়ত আতংকে থাকে কবে তারা তাদের সর্বস্ব হাড়িয়ে গরীব হয়ে পড়বেন। তাদের অনেকে চরম এক ঝুঁকি পূর্ন অবস্থায় আছেন। ইতি মধ্যেই বহু লোক ভুমিহীনে পরিণত হয়েছেন। এখন গ্রমের নানা জায়গায় মানুষ না খেয়ে থাকে। ঝুকিতে জীবন কাটায়। অনেকেই প্রচুর ধার কর্জের শিকার হয়ে চরম পরিস্থির সম্মোখিন। কর্জের চক্র থেকে তারা বেড়িয়ে আসতে পারছেন না । বহুপরিবার আছেন যারা পিতা মাতার পর তাদের সন্তানাদি ও ভূস্বামীদের, পুঁজিপতিদের ও কিছু সংস্থার দাসে পরিণত হচ্ছেন। একটু ভালো থাকার আশায় অনেকেই গ্রাম ছেড়ে শহরের দিকে চলে গেছেন। শহরে ও আধা সামন্তবাদি বর্বরতার মিশ্রনে এক নিস্টুর উদারতাবাদি পুঁজিবাদের বকাশ চলছে। সহজ সরল মানুষেরাই বেশী কষ্ট করছেন। তাদের শিশুরা, তাদের নারীরা, তাদের মেয়েরা অনেক ক্ষেত্রে মানব পাচারের শিকার হয়েছে। তাদের দেহ আন্তর্জাতিক বাজারের পন্য হচ্ছে। এখন মানুষ এখানে পন্য হিসাবে গন্য।

কাহিনী

সে একটি লাল সাড়ি পড়ে কান্না জড়িত অবস্থায় ঘরে আসল, তাঁর চোখের নিচে কাল দাগ পড়ে আছে, তাঁর হাতে একটি ব্যাগ। সে তাঁর জীবনের গল্প ধীরে ধীরে বলতে লাগল। তাঁর ভাষা ছিলো বেদনা বিদুর। সুফিয়া, বাংলাদেশের উত্তর দক্ষিনের মহানগর খুলনার একটি গ্রমের বাসিন্দা সে। তারা পিতা মাতা ছিলেন দরিদ্র চাষি। সে তাঁর বাবা মায়ের ৮ জন সন্তানের মধ্যে একজন। আমার পিতা মাতা আমাকে খাওয়াতে পড়াতে পারেন নি, সে জানাল আমাদের খাওয়া পড়ার জন্য পর্যাপ্ত টাকা পয়সা নেইতাই আজ আমার এই অবস্থাযখন সুফিয়ার বয়স ছিলো ১৪ বছর তাঁর এক প্রতিবেশী মহিলা এসে তার মা বাবাকে বলল কোলকাতায় তার কাছে কাজের মেয়ে হিসাবে একটি ভালো বেতনের চাকুরী আছে। তার জীবন সুখী হবে। সে ইংলিশ শিখতে পারবে। সে আগামীতে অনেক টাকা পয়সার মালিক হতে পারবে। সুফিয়া বলল সেই কথা শুনে আমি খুবই খুশি হলাম। সুফিয়া বলল, ‘ আমরা কয়েক দিনের মধ্যেই কলকাতায় এসে পৌছলাম, দেখলাম আমি ভুল জায়গায় এসেছি। এর আগে আমার খনকি পাড়া সম্পর্কে কোন ধারনাই ছিলোনা। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস সেই মহিলা আমাকে সেই নষ্ট জায়গায় নিয়ে এলো। সেই ঘরটিতে দেখতে পেলাম মেয়েরা অর্ধ নগ্ন পোষাক পরে ঘুরা ফেরা করছে। আর পুরুষরা ঘরে আসছে আর বেড়িয়ে যাচ্ছে আমার প্রতিবেশী মহিলা আমাকে এখানে রেখে ৫০,০০০ টাকা নিয়ে পালিয়ে গেলো।

আরো একটি কাহিনীঃ

জেচি আমাকে প্রায় বলত যে সে নাকি আমাকে ৪০,০০০ টাকা দিয়ে কিনে এনেছে। মনিরা ও জয়তি নাকি আমাকে তার কাছে বিক্রি করেছে। তাই আমাকে কাজ করতেই হবে। বেদেনা বলল, আমার মালিক স্বামী স্ত্রী দু জন ই আমার উপর নির্যাতন চালাত। তারা আমার গায়ে গরম পানি ঢেলে দিত।

তরকারী কুটার ছুরি দিয়ে আমার গায়ে প্রায়ই মারত। বেদেনা জানালো, জেছি প্রায়ই মঙ্গল বার সকল বেলা আমাকে নাস্তা তৈরীতে দেরী করার জন্য নির্যাতন চালাত। এমন মার আমাকে মারত যে আমি অজ্ঞান হয়ে পড়তাম। সে আমাকে বেহুস অবস্থায় গোসল খানায় ফেলে রাখত। আমার হুস ফিরে পেলে আমি উঠে আসতাম”।

এবং

“ একজন অতি দরিদ্র কৃষক বাবা তার ছেলেকে ঢাকায় পাঠালো গৃহের কাজ করার জন্য, বলল মুহাম্মদ সাদেক আলী তার এক চাচত বোন ইয়াসমিন ঢাকার মুহাম্মদ পুরের এক বাসায় কাজ দেবার কথা বলে কিশোরগঞ্জ থেকে প্রায় দেড় মাস আগে নিয়ে আসে। এবং মুহাম্মদ পুর মসজিদের কাছে এক বাসায় তার বাসার চাকর হিসাবে কাজ দেয়।

‘ আমি যে বাসায় কাজ করি তারা সারা দিনে মাত্র একবার আমাকে খাবার দেয়। কেবল সকল বেলায় আমাকে কিছু ভাত দেয় তারা আর কিছু নয়’,…….

মাসুম সর্বদা ভয়ে থাকে। তার পিঠে এব্রু তেব্রু কালো দাগ অভিশাপের মত লেগে আছে। সে জানাল, তাকে লোহার রড, তারের বান্ডিল, ও লাঠি দিয়ে পেটানো হয়েছে। তার হাতে কনুইয়ে কালো দাগ পড়ে আছে। সে আমাকে পুরিয়ে ফেলতে চেয়েছিলো। মাসুম বলল তার এক চাচাত বোন গত শুক্রবার তাকে সেই নিস্টুর মহিলার কাছ থেকে উদ্দার করেছে। সে সরকারের কাছে এই নির্মমতার জন্য বিচার চায়।

শিশুটি একটি টয়লেটের পাশে ঘুমায়। মেঝেটি প্রায়ই ভেজা থাকে। সে কাপড় ধোয়ার কাজ করে। সে পরিবারের সকল লেপ তুষক চাদে নিয়ে গিয়ে রোধে শুকাতে দেয়। মালিকের ঘরের মেঝে মুছে, কাপড় ধুয়ে শুকিয়ে দেয়”।

এবং

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশী কর্মীদেরকে মারাত্মক ভাবে শোষন করা হচ্ছে। সুজাকথায় এটা এক প্রকার মানব পাচার ছাড়া আর কিছুই নয়। বাংলাদেশ সরকার এবং মালয়েশিয়ার সরকার শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষা করতে পারছেন না । মালয়েশিয়ার শ্রমিক অধিকার বাস্তবায়ন কারী সংস্থা ইরিনা ফার্নান্ডেজ তাঁর বক্তব্যে তা প্রকাশ করেছেন।

যখন মালয়েশিয়ায় অতিরিক্ত কর্মী আনা হয় তখন তাদের প্রধান লক্ষ্যই থাকে কত দ্রুত টাকা বানানো যায়। যারা শ্রমিক আমদানী করেন তারা বলেম আমাকে ৫০০ রিঙ্গিট দাও আর যেখানে খুশি সেখানে যাও আর কাজ কর। আর এই ভাবেই আমদানী কারক কোম্পানি গুলো বাংলাদেশী শ্রমিকদেরকে দাসত্বের দিকে ঠেলে দেয়। কিছু দালাল আছেন তারা শ্রমিকদেরকে বলে যাও তোমরা কাজ কর আর আমি তোমাদেরকে খাবার ও থাকার ব্যবস্থা করছি। শ্রমিক দেরকে এই ভাবেই দুই, তিন চার মাস কাজ করায়”।

প্রথম বিশ্বের মানুষ আমাদেরকে দাস বানিয়ে বেশ সুখে ই বিলাসী জীবন যাপন করছেন। তারা আমাদের দুঃখ কষ্ট দেখেন না। বুঝেন না আমাদের বেদনার ভাষা। আমাদের উৎপাদিত সস্তা পন্য দিয়ে ঘর ভরে রাখে। আন্তর্জাতিক বহুজাতিক কোম্পানি গুলো বলে থাকেন ব্যবসার সুবিধার জন্য মানুষকে নিয়ন্ত্রনে রাখতে হবে। আমাদের রক্ত, ঘাম আর চোখের পানি হলো তাদের উন্নয়নের জ্বালানী। তারা সাম্রাজ্যের নেশায় বুদ হয়ে আছেন। দুর্নিতিবাজ রাজনৈতিক নেতারা আমাদের কথা, আমাদের ব্যাথা মোটেই বুঝতে চান না । আমাদের কান্না তাদের কানে পৌছায় না। তারা আনুগত্য করে তাদের বিদেশী প্রভুদের যারা জাতিকে শৃংখলিত করে রাখার জন্য সমর্থন যোগায়। ইসলাম পন্থীরা ও গরীবের কথা ভাবে না। দাসত্ব সম্পর্কে তাদের মনে কোন ঘৃনা আছে বলে মনে হয় না । তারা খেলাফতের নামে রক্ত বন্যা বহিয়ে দিচ্ছেকিন্তু মেহেনতি নারী পুরুষের জন্য কোন কিছুই করছেন না । সামন্ত প্রভু আর পুঁজিবাদীদের নেতারা এই বিষয় টিকে কোন গুরত্বি দিতে চান না। তারা নিজেদেরকে সাম্রজ্যবাদের দুষর হিসাবে ভাবতে ভালো বাসে। এন জিও রা মানুষের দারিদ্রতা নিয়ে টাকা বানাতে ব্যস্ত। তারা সাম্রাজ্যবাদের দুষর হিসাবে মানুষকে নিয়ন্ত্রন করতে ভুমিকা পালন করে থাকে।

শৃংখলা ছাড়া আমাদের হারাবার আর কিছু নেই। দারিদ্রতা, ক্ষুধা, সহিংসতা, আশিক্ষা, ও দাসত্বকে না বলুন ! আমরাই তো সম্পদের সৃজন করি। আমরা কাজ করি। আমরা খাদ্য উৎপাদন করি। আমরা সংখ্যা গরিস্ট। তাদের জন্য ই আমাদের প্রয়োজন। আমাদেরকে ছাড়া উদের চলবে না। আমাদের তাদের দরকার নেই। আমরা তাদের ছাড়াই চলতে পারব। আমাদের হাতেই ক্ষমতা আসবে যদি আমাদের সাহস বাড়াতে পারি। মরা স্বাধিনতা, জমি,বাড়ী, স্বাস্থ্য, উন্নয়ন, কাজ, মর্যাদা, পরিবার এবং আমাদের সমাজকে “হ্যাঁ” বলি! আজ আমরা আমাদের বীজ রোপন করছি। আমরা আমাদের পরিবার ও সমাজকে এগিয়ে নেব। সামগ্রীক স্বাধিনতা, সামগ্রীক বিপ্লবের পথে। তা আমাদের সন্তানদের জন্য তাদের সন্তানদের জন্য। আমরা একটি সুন্দর পৃথীবী গড়ার জন্য বিপ্লবের পথে এগিয়ে যাব। সামগ্রীক সমাজ পরিবর্তনের জন্য । আগামী দিন আমাদের জন্য । আলোকিত সাম্যবাদের জন্য। সকল মানুষের মুক্তির জন্য।# শিহাব

Leave a Reply